টেকসই সেবার মিথ: কেন চিকিৎসকের ফি-ই হতে পারে উন্নত চিকিৎসাসেবার ভিত্তি

টেকসই সেবার মিথ: কেন চিকিৎসকের ফি-ই হতে পারে উন্নত চিকিৎসাসেবার ভিত্তি

১. শুরুতেই ভাঙতে হবে ‘ত্যাগী চিকিৎসক’-এর ভুল ধারণা

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার একটি প্রচলিত ও ক্ষতিকর ধারণা হলো—কোনো কাজ সত্যিকার অর্থে মহৎ বা সেবামূলক হতে হলে সেটি কম খরচে, কিংবা সম্ভব হলে বিনামূল্যে করতে হবে। বিশেষ করে চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশাটি আরও প্রবল।সমাজ যেন চিকিৎসককে দুটি পরিচয়ের একটিকে বেছে নিতে বলে—তিনি হয় একজন “নিঃস্বার্থ সেবক”, নতুবা একজন “ব্যবসায়ী”।কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।সেবা এবং পারিশ্রমিক একে অপরের বিপরীত নয়। বরং একটি মানসম্পন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অপরিহার্য।

আমাদের বুঝতে হবে—সেবাকে অর্থনৈতিক মূল্য থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সেবার মর্যাদা বাড়ে না; বরং একসময় সেই সেবার মান ও অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে।তাই চিকিৎসা পেশায় আমাদের নতুন একটি ধারণাকে গ্রহণ করতে হবে—Professional Sustainability বা পেশাগত স্থায়িত্ব।


২. সেবা একটি কাজের পরিচয়, মূল্যের ট্যাগ নয়

‘সেবা’ মানেই বিনামূল্যে কাজ—এই ধারণাটি মৌলিকভাবেই ভুল।

সেবা হলো মানুষের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, শ্রম, সময় বা সম্পদ ব্যবহার করা। সেই কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া হলে তার মানবিক মূল্য হঠাৎ করে শেষ হয়ে যায় না।

আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

  • শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন এবং তার বিনিময়ে বেতন পান।
  • নার্স রোগীর পাশে থেকে জীবন রক্ষাকারী ও পরিচর্যামূলক সেবা দেন এবং তার জন্য পারিশ্রমিক পান।
  • প্রকৌশলী ভবন, সেতু, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ব্যবহার করেন এবং তার বিনিময়ে অর্থ পান।
  • চিকিৎসক দীর্ঘ বছরের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দেন এবং তার বিনিময়ে পেশাগত ফি গ্রহণ করেন।

তাহলে শুধু চিকিৎসকের ক্ষেত্রেই কেন ‘সেবা’ মানেই ‘বিনা পারিশ্রমিকে কাজ’ হবে?

পারিশ্রমিক নেওয়া কোনো কাজকে অসেবামূলক করে না।

বরং একজন দক্ষ পেশাজীবীর শ্রম ও জ্ঞানকে সম্পূর্ণ অবমূল্যায়ন করলে শেষ পর্যন্ত সেই পেশার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেবার মূল্য টাকা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
আবার পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেই কোনো সেবা আর সেবা থাকে না—এমনটিও সত্য নয়।


৩. রোগীর নিরাপত্তার পেছনে যে বিশাল অবকাঠামো থাকে

চিকিৎসকের উদ্দেশ্য মানবিক হতে পারে, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাসেবা কোনো ব্যক্তিগত আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি একটি জটিল, সংগঠিত এবং উচ্চ-ঝুঁকির ব্যবস্থা।

একটি মানসম্মত হাসপাতাল পরিচালনার জন্য দরকার—

  • দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন;
  • নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা পরিবেশ;
  • আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি;
  • নিয়মিত যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ;
  • নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি;
  • নিরাপদ ডিজিটাল স্বাস্থ্য-তথ্য ব্যবস্থাপনা;
  • নতুন প্রযুক্তি ও চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ;
  • চিকিৎসক ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন।

এসবের কোনোটিই বিনামূল্যে আসে না।

তাই হাসপাতালের আর্থিক সক্ষমতা শুধুমাত্র ‘লাভ’ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছে রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ।

একটি প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘদিন আর্থিকভাবে দুর্বল থাকে, তাহলে একসময় তার যন্ত্রপাতি পুরোনো হবে, দক্ষ কর্মীরা অন্যত্র চলে যাবেন, প্রশিক্ষণ কমে যাবে এবং চিকিৎসার মানও ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।

অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা ধরে রাখতে পারে না।


৪. একজন চিকিৎসকের ফি আসলে ২০ মিনিটের মূল্য নয়

একজন রোগী যখন একজন চিকিৎসকের কাছে ২০ মিনিট পরামর্শ নেন, তখন তিনি আসলে সেই ২০ মিনিটের জন্যই টাকা দিচ্ছেন না।

তিনি মূল্য দিচ্ছেন একটি দীর্ঘ Skill Chain-এর জন্য:

শিক্ষা → প্রশিক্ষণ → দক্ষতা → অভিজ্ঞতা → সিদ্ধান্ত → রোগীর চিকিৎসা

একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হতে বছরের পর বছর শিক্ষা, কঠোর প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা, ত্যাগ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।এরপরও শেখা শেষ হয় না।নতুন গবেষণা পড়তে হয়, সম্মেলনে অংশ নিতে হয়, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হয়, নিজের দক্ষতা নিয়মিত আপডেট করতে হয়।

ন্যায্য পারিশ্রমিক একজন চিকিৎসককে সেই সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে তিনি—

  • নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারেন;
  • পেশাগত বার্নআউট কমাতে পারেন;
  • নতুন জ্ঞান ও গবেষণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে পারেন;
  • প্রশিক্ষণ ও সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন;
  • রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন;
  • অতি-উচ্চ রোগীসংখ্যার ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’ চিকিৎসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।

অর্থাৎ ন্যায্য ফি শুধু চিকিৎসকের আয় নয়; এটি ভালো চিকিৎসায় পুনঃবিনিয়োগের একটি মাধ্যম।


৫. আসল সমস্যা টাকা নেওয়া নয়—অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়া

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি করতে হবে।

ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং রোগী শোষণ এক জিনিস নয়।

একজন চিকিৎসক যদি স্বচ্ছভাবে বলেন—

“আমার পরামর্শ ফি ১,০০০ টাকা।”

এরপর রোগীকে সঠিকভাবে পরীক্ষা করেন, প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় করেন এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা ওষুধ না দেন—তাহলে এটি একটি স্বচ্ছ ও নৈতিক পেশাগত লেনদেন।অন্যদিকে কেউ যদি ‘ফ্রি’ বা খুব কম খরচে চিকিৎসার কথা বলে রোগীকে আকৃষ্ট করেন, কিন্তু পরে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কমিশনভিত্তিক রেফারেল, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা দীর্ঘায়িত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায় করেন—তাহলে সেটি সেবা নয়, শোষণ।

তাই নৈতিকতার প্রশ্নটি হওয়া উচিত—

“চিকিৎসক টাকা নিচ্ছেন কি না?”—এটি নয়।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“তিনি কি ন্যায্যভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থে টাকা নিচ্ছেন?”

সমস্যা টাকা নেওয়ায় নয়।

সমস্যা হলো অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়ায়।


৬. ভবিষ্যতের পথ: ‘Cross-Subsidization’ বা পারস্পরিক সহায়তার মডেল

এখন প্রশ্ন হলো—তাহলে দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বা বিনামূল্যের চিকিৎসা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?

এর একটি বাস্তবসম্মত উত্তর হলো Sustainable Service Model বা টেকসই সেবা মডেল।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Cross-Subsidization—অর্থাৎ সক্ষম রোগীর কাছ থেকে যথাযথ পারিশ্রমিক নিয়ে সেই আয়ের একটি অংশ ব্যবহার করা দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের জন্য।

ধরা যাক, একজন আর্থিকভাবে সক্ষম রোগী একটি উন্নতমানের চিকিৎসাসেবার জন্য বাজারসম্মত ফি দিলেন।

সেই আয়ের মাধ্যমে হাসপাতাল—

  • উন্নত প্রযুক্তি কিনতে পারে,
  • দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারে,
  • অবকাঠামো উন্নত করতে পারে,
  • চিকিৎসার মান বজায় রাখতে পারে,
  • এবং একই সঙ্গে দরিদ্র রোগীদের জন্য ভর্তুকি বা বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে।

এখানে ব্যবসা বনাম সেবা—এমন কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

বরং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে—

ব্যবসায়িক স্থায়িত্বই মানবিক সেবার অর্থনৈতিক ভিত্তি হতে পারে।

একটি হাসপাতাল যদি আজকের আবেগের ওপর নির্ভর করে কিছুদিন বিনামূল্যে সেবা দেয়, কিন্তু পাঁচ বছর পর অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়—তাহলে সেটি কতটা মানবিক?তার চেয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কি বেশি মানবিক নয়, যা আগামী ৩০ বছর ধরে দরিদ্র মানুষের পাশে থাকতে পারে?

টেকসই সেবা মানে শুধু আজ কাউকে সাহায্য করা নয়; আগামী প্রজন্মের জন্যও সেই সাহায্যের সক্ষমতা তৈরি করে যাওয়া।


৭. আমাদের নৈতিকতার সংজ্ঞাটাই নতুন করে ভাবতে হবে

সেবা এবং পেশাদারিত্ব একে অপরের শত্রু নয়।

বরং তারা একই ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

একজন চিকিৎসক পারিশ্রমিক নিলেই তার সেবার মহত্ত্ব কমে যায় না। একজন চিকিৎসকের কাজকে অনৈতিক করে তোলে তার অসততা, অদক্ষতা, রোগীর প্রতি অবহেলা বা আর্থিক স্বার্থে রোগীকে শোষণ করা—পারিশ্রমিক গ্রহণ করা নয়।

সত্যিকারের পেশাদারিত্ব দাঁড়িয়ে আছে চারটি ভিত্তির ওপর—

দক্ষতা + সততা + দায়িত্ববোধ + মানবিকতা

এই চারটি থাকলে একজন চিকিৎসক একই সঙ্গে পেশাজীবী এবং সেবক হতে পারেন।

আমাদের তাই ‘সেবা’ শব্দটির অর্থ নতুন করে বুঝতে হবে।

ন্যায্য ফি সেবার সমাপ্তি নয়; বরং টেকসই সেবার ভিত্তি।

কারণ আমরা যদি আমাদের সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর যথাযথ মূল্য দিতে অস্বীকার করি, তাহলে একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করতে হবে—

যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ওপর আমাদের জীবন নির্ভর করে, সেই জ্ঞানকে আমরা যদি মূল্য দিতে না চাই, তাহলে আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই দক্ষতাটি টিকে থাকবে—এমন আশা করি কীভাবে?

চিকিৎসককে ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া চিকিৎসাকে ব্যবসায় পরিণত করে না।
বরং ন্যায্য ও স্বচ্ছ পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাই পারে মানবিক চিকিৎসাসেবাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে।

**সেবা বিনামূল্যের নাম নয়।

সেবা হলো মানুষের জন্য নিজের দক্ষতা ও সামর্থ্যকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা।
আর সেই সেবাকে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন—টেকসই পেশাদারিত্ব।**

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest Post

Related Articles

১. শুরুতেই ভাঙতে হবে ‘ত্যাগী চিকিৎসক’-এর ভুল ধারণা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার একটি প্রচলিত ও ক্ষতিকর ধারণা

ভূমিকা আমরা অনেকেই মনে করি যে শৈশবের পর আমাদের মস্তিষ্কের গঠন আর বদলায় না, এটি

বাংলাদেশে মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত (Spinal Cord Injury – SCI) ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের জন্য জীবন প্রায়শই

IBN-SINA Savar

Call to make an appointment.

09610010615

IBN-SINA kallyanpur

Call to make an appointment.

09610009616